যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। দেশটির পুঁজিবাজারে প্রবল আর্থিক উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও ব্যক্তি পর্যায়ে ঋণসংক্রান্ত জটিলতা এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছে। গাড়ির ঋণ, ক্রেডিট কার্ড বা শিক্ষা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার হার এখন ঊর্ধ্বমুখী। সব মিলিয়ে দেশটির নাগরিকদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার সূচক বা ক্রেডিট স্কোর এখন ২০০৭ সালের অর্থনৈতিক মহামন্দার পর সবচেয়ে দ্রুত গতিতে কমছে। খবর সিএনএন।
ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অতিপ্রচলিত সূচক হলো এফআইসিও স্কোর। সূচকটি তৈরি করে অ্যানালিটিকস কোম্পানি ফেয়ার আইজাক করপোরেশন (এফআইসিও)। তাদের হিসাব অনুসারে, টানা দুই বছর মার্কিনদের ক্রেডিট স্কোর কমছে। কারণ অনেক মার্কিন গাড়ির ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত ঋণ শোধ করতে পারছেন না।
এফআইসিও আর্থিক রেটিংয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে ঋণ নেয়ার ইতিহাস, বিল পরিশোধের ধারাবাহিকতা, কতটা ঋণ বাকি আছে, কত ধরনের ঋণ নিয়েছেন ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় গড় এফআইসিও স্কোর দুই পয়েন্ট কমেছে, যা ২০০৯ সালের পর সবচেয়ে বড় পতন।
তবে বর্তমান ক্রেডিট স্কোর ২০০৭-এর মহামন্দার তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু টানা দুই বছর তা নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় রেখেছে। এফআইসিও বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ঋণগ্রহীতারা ক্রমবর্ধমান হারে ঋণের কিস্তি পরিশোধে পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণরা আরো বেশি আর্থিক চাপের মুখে রয়েছেন। উচ্চ শিক্ষা ঋণ ও নিম্নমানের বেতনের চাকরি তাদের ঘাড়ে দ্বিগুণ বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।
১৯৯৭-২০১২ সালের মধ্যে যাদের জন্ম সেই জেনারেশন জেড বা জেনজি ঋণগ্রহীতাদের গড় ক্রেডিট স্কোর তিন পয়েন্ট কমেছে। যেকোনো বয়সী গোষ্ঠীর মধ্যে কভিড-মহামারীর সময় থেকে এটি সবচেয়ে বড় পতন।
ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার এ ঘাটতিকে ফুলেফেঁপে ওঠা ওয়াল স্ট্রিট ও সাধারণ মার্কিনদের মধ্যে বেড়ে চলা ব্যবধানের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এফআইসিওর সিনিয়র ডিরেক্টর টমি লির মতে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে যেখানে শেয়ারবাজার ও আবাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ভালো আছেন, অন্যরা উচ্চ সুদহার ও ব্যয় নিয়ে সমস্যায় ভুগছেন।
২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব ছিল আকাশছোঁয়া। লাখ লাখ মার্কিন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। তখন ক্রেডিট স্কোরও দ্রুত নেমে যায়। এরপর ২০১৩-২৪ সাল পর্যন্ত ক্রেডিট স্কোর প্রতি বছর বাড়ে, ২০২৪ সালে এসে ১ পয়েন্ট কমে যায়।
গাড়ির ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত ঋণে খেলাপির হার এখন ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এফআইসিও বলছে, গাড়ি, ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত ঋণে খেলাপির হার এখন অর্থনৈতিক মন্দার সময়ের মতো আচরণ করছে। তবে বন্ধকি ও হোম-ইকুইটি খাতে খেলাপির হার এখনো কম এবং স্বাভাবিক স্তরে রয়েছে।
গত এক বছরে ১৪ শতাংশ জেনজি গ্রাহকের ক্রেডিট স্কোর ৫০ পয়েন্ট বা তার বেশি কমেছে, যা এর আগে কোনো বছরে হয়নি এবং ২০২১ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। এসব ঋণের একটি অংশ হলো শিক্ষা ঋণ। কভিডকালে শিক্ষা ঋণ খেলাপি রিপোর্ট স্থগিত থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় সেই ঋণ আদায় শুরু হয়েছে। নীতিগত এ পরিবর্তন জেনজির ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৪ শতাংশের ঋণ এখনো পরিশোধ হয়নি, যা জাতীয় গড়ের দ্বিগুণ।
গত ফেব্রুয়ারি-এপ্রিলে প্রায় ৬১ লাখ গ্রাহকের ক্রেডিট ফাইলে শিক্ষা ঋণ খেলাপির তথ্য যুক্ত হয়েছে। এ সময় খেলাপির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ২৯ শতাংশে। এ খাতে ২ কোটি ১০ লাখ ঋণগ্রহীতার কিস্তি বকেয়া রয়েছে। আরো ১৯ লাখ শিক্ষার্থীর কিস্তি বকেয়া থাকলেও তা এখনো খেলাপি হিসেবে যোগ হয়নি।
তরুণ মার্কিনদের জন্য আরেকটি সমস্যা হলো নতুন স্নাতকদের জন্য কঠিন চাকরির বাজার। তেমন একজন দিমিত্রি টসলাকিস (২২)। গত বছর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকের পর থেকে কয়েকশ চাকরিতে আবেদন করেছিলেন তিনি। পাস করার ১৪ মাস পর একটি আইনি সংস্থায় পূর্ণকালীন চাকরি পান টসলাকিস, কিন্তু সেখানে রেস্তোরাঁর কাজের তুলনায় অনেক কম বেতন পাচ্ছেন। এ তরুণের রয়েছে ৩৫ হাজার ডলারের শিক্ষা ঋণ। গাড়ির কিস্তি ও অন্যান্য খরচ সামলাতে গিয়ে তিনি সেই ঋণ পরিশোধ স্থগিত রেখেছেন।
ফিলাডেলফিয়া ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের জুলাই জরিপ অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় ১৯ শতাংশ গ্রাহক কোনো না কোনো বিল আংশিক পরিশোধ করেছেন বা বাদ দিয়েছেন, আগের বছর যা ছিল ১৭ শতাংশ। জরিপে ৪৭ শতাংশ গ্রাহক বিলাসপণ্যে খরচ বাদ দেয়ার তথ্য জানিয়েছেন, ২৩ শতাংশ প্রয়োজনীয় খরচও কমাতে বাধ্য হয়েছেন।
এফআইসিও জানিয়েছে, শিক্ষা ঋণ থাকা ৬৪ শতাংশ জেনজি ও ৬১ শতাংশ মিলেনিয়াল খরচ মেটাতে ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত ঋণের ওপর নির্ভর করছেন।
আর্থিক টানাপড়েনে অনেক মার্কিন দ্বিতীয় চাকরির দিকেও ছুটছেন। তেমনই একজন ফিলাডেলফিয়ার নার্স সু মারফি। দ্বিতীয় চাকরির কারণে একটানা ১২ দিন কাজের পর একদিন ছুটি পান তিনি। মারফির পরিকল্পনা ছিল ১০ বছর কিস্তি দেয়ার পর শিক্ষা ঋণের বাকি টাকা মওকুফ হয়ে যাবে। কারণ ফিলাডেলফিয়ার যে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করেন, সেটি ‘পাবলিক সার্ভিস লোন ফরগিভনেস’-এর আওতাভুক্ত। কিন্তু মারফির আশঙ্কা, তার ঋণ মওকুফ হবে না। কারণ সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন সে নিয়ম পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে।